দুর্ঘটনা থেকে সফলতার সফরে অঞ্জনা
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৭-০৬-২০২৬ ০১:২৭:৫৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৭-০৬-২০২৬ ০১:৩৬:৩৫ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
স্বামীর ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর দুই সন্তানের লালনপালন ও সংসারের খরচ চালাতে পড়েছিলেন সংকটে। কিন্তু থেমে যাননি অঞ্জনা বড়ুয়া। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেন নতুন পথচলা। সেই ছোট্ট উদ্যোগই আজ তাকে পরিচয় দিয়েছে সফল ডেইরি খামারির।
এখন তার খামারে প্রায় ২৫-৩০ লাখ টাকা মূল্যের ১২টি গরু। প্রতিদিন দুধ বিক্রি করে মাসে আয় করছেন লাখ টাকার বেশি। সম্প্রতি কোরবানির ঈদের আগে দুটি গরু বিক্রি করে আয় করেছেন আরও দুই লাখ টাকা। অঞ্জনার এই গল্প লড়াই, সাহস আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। কক্সবাজারের রামু উপজেলার পূর্ব রাজারকুল বড়ুয়াপাড়ার গৃহবধূ অঞ্জনা বড়ুয়া। অঞ্জনার স্বামী নিতুপূর্ণ বড়ুয়া পেশায় নলকূপ মেকানিক।
২০১৬ সালের শেষ দিকে পূর্ব মেরং লোয়ার এলাকায় একটি বাড়িতে নলকূপ বসানোর সময় আগুনে গুরুতর দগ্ধ হন তিনি। শরীরের অধিকাংশ অংশ পুড়ে যাওয়ায় টানা তিন মাস চিকিৎসা নিতে হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বাড়ি ফিরলেও কর্মক্ষম ছিলেন না দীর্ঘদিন। ফলে সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অক্ষম হয়ে পড়ায় পরিবারে নেমে আসে আর্থিক সংকট।
সেই সময়ের কথা স্মরণ করে অঞ্জনা বড়ুয়া বলেছেন, ‘স্বামীর চিকিৎসা, দুই সন্তান এবং সংসারের ব্যয় সামলাতে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। সেই সময় আমার চাচাতো বোন মিলি স্বামীর ওষুধ ও প্রয়োজনীয় খরচের জন্য পাঁচ হাজার টাকা দেন। সেই অর্থই আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।’
পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে চার হাজার টাকা দিয়ে এক কানি জমি বর্গা নেন তিনি। বাকি টাকা দিয়ে কেনেন বীজ ও সার। শুরু করেন বরবটি ও ধানের চাষ। প্রথম বছরেই বরবটির ভালো ফলন হওয়ায় লাভ পান কৃষিকাজ থেকে। সেই আয় দিয়ে কেনেন একটি ছাগল। পরে ছাগল বিক্রি করে কেনেন সাইওয়াল জাতের একটি বাছুর। ধীরে ধীরে শুরু করেন গরু পালন।
শুরুর দিকে তার খামারে প্রতিদিন মাত্র পাঁচ লিটার দুধ উৎপাদন হতো। সেই দুধ বিক্রির জন্যও পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে। প্রতিদিন সকালে বড় ছেলে নিলয় বড়ুয়াকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে দুধ বিক্রি করতেন তিনি। সময়ের সঙ্গে দুধের চাহিদা বাড়তে থাকলে অন্য খামারিদের কাছ থেকেও দুধ সংগ্রহ করে বিক্রি শুরু করেন।
কৃষিকাজ, দুধ বিক্রি এবং সঞ্চিত অর্থের সঙ্গে ধার করা টাকা মিলিয়ে প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে কেনেন বিদেশি জাতের একটি সাইওয়াল গাভি। সেই গাভি থেকেই বিস্তার শুরু হয় তার ডেইরি খামারের। এখন তার খামারে গাভি ও বাছুর মিলিয়ে আছে ১২টি গরু। এর মধ্যে প্রতিদিন দুধ দেয় ছয়টি গাভি।
অঞ্জনার ভাষ্য, একটি গাভি থেকে প্রতিদিন ৩২-৩৫ লিটার পর্যন্ত দুধ পাওয়া যায়। দুধ বিক্রি থেকে মাসে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা আয় হয়। এ ছাড়া কোরবানির ঈদের আগে দুটি গরু বিক্রি করে ২ লাখ টাকা আয় করেছেন। খামারের আয় দিয়ে স্বামীর চিকিৎসার জন্য নেওয়া প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকার ঋণ পরিশোধ করেছেন তিনি। পাশাপাশি পূর্ব রাজারকুল ও পূর্ব মেরংলোয়াতে কিনেছেন চার গন্ডা জমিও।
অঞ্জনা বড়ুয়া বলেছেন, ‘অনেক কষ্ট করেছি। ওপরওয়ালার কৃপায় আজ আমি স্বাবলম্বী হয়েছি। স্বামীর সহযোগিতাও পাচ্ছি। নারীরা ঘরে বসে না থেকে পরিশ্রম ও পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলে সফলতা আসবেই।’
অঞ্জনার বড় ছেলে নিলয় বড়ুয়া। সে রামু খিজারী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে জানায়, তার মা গরুগুলোকে পরিবারের সদস্যের মতোই ভালোবাসেন। লক্ষ্মী, মাঝনী, সুন্দরী, চঞ্চুরানী, ধলুনি, ছিয়ামী, খরগুসসা, রাজা বাবু, কালা রাজা ও পূর্ণিমা নামে প্রতিটি গরুকে আলাদাভাবে ডাকেন তিনি।
নিলয়ের ছোট ভাই পূর্ব রাজারকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
স্বামী নিতুপূর্ণ বড়ুয়া জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর তার স্ত্রী পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে নিরলস পরিশ্রম করেছেন। তার শ্রম ও দৃঢ়তার কারণেই আজ পরিবারটি ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে। তিনিও এখন খামারের কাজে সহযোগিতা করছেন।
স্থানীয়রা জানালেন, অঞ্জনার সাফল্যের পেছনে রয়েছে অক্লান্ত পরিশ্রম ও অধ্যবসায়। কঠিন সময়ে নিজের পরিবারের কষ্ট সহ্য করেও গরুর পরিচর্যায় অবহেলা করেননি তিনি। বর্তমানে সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে একাধিক পুরস্কারও পেয়েছেন।
রামু উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা অসীম বরণ সেন জানিয়েছেন, অঞ্জনা নিয়মিত প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শ নিয়েছেন। গরুর চিকিৎসা, টিকা, কৃত্রিম প্রজননসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হয়েছে তাকে। এ ছাড়া, ঘাস কাটার মেশিন ও দুধ দোহনের মেশিনও সরবরাহ করা হয়েছে। তার আগ্রহ, পরিশ্রম ও নিষ্ঠা অন্য নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণার উদাহরণ।
অঞ্জনা বড়ুয়ার সাফল্যের গল্প শুধু একজন ডেইরি খামারির অর্থনৈতিক উন্নতির গল্প নয়। এটি প্রতিকূল পরিস্থিতিকে জয় করে আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার এক অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত।
বাংলাস্কুপ/ প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স